মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

বজরা শাহী জামে মসজিদ

মোগল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন ঐতিহ্যবাহী বজরা শাহী জামে মসজিদ। নোয়াখালীর মাইজদী প্রধান শহর হতে প্রায় ১৫ কিঃমিঃ উত্তরে সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা নামক স্থানে প্রধান সড়কের পশ্চিম পার্শ্বে বিখ্যাত এই বজরা শাহী জামে মসজিদ অবস্থিত। নোয়াখালীসহ সমগ্র বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচারে রয়েছে এর ঐতিহাসিক অবদান। দিল্লীর মোগল সম্রাটগণ অবিভক্ত ভারতবর্ষে ৩০০ বছরের অধিককাল রাজত্ব করেন। এ দীর্ঘ সময়কালে মোগল সম্রাটগণ এবং তাদের উচ্চপদস্থ আমলারা বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ইমরাত, মসজিদ নির্মাণ করেন যা আজো স্থাপত্যে শিল্পের বিরল ও উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে বিরাজমান। এগুলোর মধ্যে আগ্রার তাজমহল, সেকেন্দ্রা, দেওয়ানে আম, আগ্রার দুর্গ, দিল্লীর লাল কেল্লা ও দিল্লীর শাহী জামে মসজিদ অন্যতম। দিল্লীর বিখ্যাত জামে মসজিদের অনুকরণে মোগল (জমিদার) আমান উল্লাহ খান ১১৫৪ হিজরি সাল, ১১৩৯ বাংলা মোতাবেক ১৭৮১ সালে অর্থাৎ প্রায় তিনশত বছর পূর্বে বজরা শাহী মসজিদ নির্মাণ করেন যা আজো মোগল স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে দেশী-বিদেশী পযটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে।

 

সোনাইমুড়ী জামে মসজিদ

সোনাইমুড়ী বাজারের প্রথম মসজিদ সোনাইমুড়ী জামে মসজিদ। উক্ত মসজিদের নাম আসলেই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হয় সর্বজনাব মরহুমম মৌলবি মোঃ ইউসুফ সাহেবের নাম যিনি ১৯২৬ সালে নিজ বাড়ির দরজায় প্রথমে একটি চাদর ও চার কোণে চারটি খুঁটি গাড়িয়ে নামাজ পড়া শুরু করে তারপর দু-চারজন মুসুল্লি নিয়ে জামাত শুরু করেন। আস্তে আস্তে মুসুল্লির সংখ্যা বাড়ার কারণে তিনি চিন্তা করলেন একটা মসজিদ কিভাবে করা যায়। পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিয়ে ছন দিয়ে ঘর বানিয়ে একটা ছোট মসজিদ নির্মাণ করলেন। সেই থেকে উক্ত মসজিদ পূর্ণাঙ্গ মসজিদ হিসেবে রূপ পায়। এভাবে বেশ কিছুদিন নামাজ চলতে থাকে এবং মুসুল্লির সংখ্যাও বাড়তে থাকে। মুসল্লিগণের সংখ্যা বাড়ার কারণে নামাজের জায়গা কম হওয়ায় তিনি মুসল্লিগণের সাথে পরামর্শ করেন কিভাবে আরো একটু বড় আকারে মসজিদ করা যায়। তখন মুসল্লিগণের সহযোগিতায় তিনি একটু বড় আকারের টিনের ছাপড়া মসজিদ নির্মাণ শুরু করেন। অত্র টিনের এই মসজিদ বেশ কয়েক বছর নামা চলতে থাকে কিন্তু দিন দিন মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকে।

 

ধর্মপরায়ণ দানবীর মৌলবি মোঃ ইউসুফ সাহেব পরবর্তীতে মসজিদটির ছাপড়া ভেঙ্গে চুন সুরকি বালু দিয়ে তাঁর নিজস্ব ২৯ শতাংশ জমিন মসজিদের নামে দান করে মসজিদটি পুনঃনির্মাণ করেন। উক্ত মসজিদটির পিছনে তৎকালীন সময়ে অর্থনৈতিক সমস্যা থাকার কারণে একজন মিস্ত্রি ও একজন জুগালী নিয়ে তিনি প্রায় পনের বছর কাজ করে মসজিদটি ভিতরে কারুকায করেন। মসজিদ ঐ কাগের উপর প্রায় সুদীর্ঘ ৭৮ বছর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

 

পরবর্তী ২০০৪ সালের শেষের দিকে মসজিদটির কারুকায নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মসজিদটিকে পূর্ণ নির্মানের চিন্তা করেন অত্র এলাকার বগাদিয়া নিবাসী মরহুম মন্তাজ দারগা সাহেবের ছেলে বিশিষ্ট সমাজ সেবক, শান্তা গ্রুপের মালিক এবং এপোলো হাসপাতেলের পরিচালক জনাব খন্দকার মনির উদ্দিন। তিনি প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে উক্ত মসজিদটির এক গম্বুজ বিশিষ্ট দোতলা নির্মাণ করেন। তাঁর এই মহৎ উদ্যোগ সোনাইমুড়ীবাসী সারাজীবন স্মরণ করবে। পাশাপাশি যার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে উক্ত মসজিদ নির্মিত হয়েছে সে ধর্মপ্রাণ, দানবীর মরহুম মৌলবি মোঃ ইউসুফ সাহেবের বিদায়ী রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

 

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোঃ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর

মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের জাতীয় সাত বীর শ্রেষ্ঠের একজন সোনাইমুড়ীবাসীর গর্বের ধন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোঃ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর বিগত ২০ জুলাই ২০০৭ সালে নোয়াখালীবাসীর আরেক গর্বিত সন্তান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধনা জেনারেল মইন উ আহমদ জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। উক্ত গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে আগত পাঠকবৃন্দ যাতে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারেন সে জন্য তিনি দুটি কম্পিউটার প্রদান করেন। নোয়াখালী জেলা সদর থেকে ২৫ কিঃমিঃ উত্তরে এবং সোনাইমুড়ী উপজেলার সদর থেকে ৮ কিঃমিঃ পশ্চিমে দেওটি ইউনিয়নভুক্ত বর্তমান রুহুল আমিন নগর (বাগপাচড়া) গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোঃ রুহুল আমিনের পৈত্রিক ভূমিতে নির্মাণ করা হয় এ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর।

গান্ধী আশ্রম

গান্ধী আশ্রম নোয়াখালীর একটি দর্শনীয় ঐতিহাসিক নিদর্শন। নোয়াখালী জেলা সদর মাইজদীকোর্ট হতে প্রায় ২৫ কিঃমিঃ উত্তরে সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ বাজার সংলগ্ন সড়কের পাশে এর অবস্থান। তৎকালীন জমিদার প্রয়াত ব্যারিস্টার হেমন্ত কুমার ঘোষের বাড়িতে উক্ত গান্ধী আশ্রম স্থাপিত হয়। বর্তমানে গান্ধী আশ্রম নোয়াখালীর একটি সেবামূলক সংগঠন হিসেবে দেশব্যাপী খ্যাতি লাভ করেছে।

 

ব্যতিক্রমধর্মী এ প্রতিষ্ঠানটির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, ১৯৪৬-এর শেষ ভাগে সারা ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে, তখন পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রভাব এসে পড়ল নোয়াখালীতে। বিশেষ করে লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ থানায় সাম্প্রদায়িকতার তান্ডবলীলা দেখা দেয়। মশালের আগুনে পুড়ে গেল বহু সাজানো সংসার, সবুজ মাটি লাল হয়ে গেল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্তের প্লাবনে।

 

শান্তি মিশনের অগ্রদূত হয়ে নোয়াখালীতে ছুটে এলেন অসহযোগ ও অহিংস আন্দোলনের পুরোধা মহাত্মগান্ধী। ভাইয়ে ভাইয়ে মিলন ঘটাতে তিনি বদ্ধপরিকর। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মিলন সাধনায় তিনি হলেন নিমগ্ন। অহিংসা, নীতিপরায়ণ, সত্যাশ্রয়ী এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথিকৃত এ মহান ব্যক্তিটির শান্তি পরিকল্পনা হল সাফল্যমন্ডিত।

 

 

শ্রী শ্রী বারাহী দেবীর বাড়ি ও মন্দির

নোয়াখালী জেলার ইতিহাস সমৃদ্ধ হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রাচীন ধর্মীয় উপাসনালয় শ্রী শ্রী বারাহী দেবীর বাড়ি ও মন্দির ১০নং আমিশাপাড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত আমিশাপাড়া গ্রামে অবস্থিত। নোয়াখালী তথা ভুলুয়ার সৃদ্ধির সাথে উক্ত বারাহী দেবীর ইতিহাস সম্পুর্ণরূপে বিজড়িত। কাজেই বারাহীদেবী নোয়াখালীর ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এর স্থাপনের ইতিহাস জনশ্রুতি মতে জানা যায়, খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে কুতুবুদ্দিনের সেনানী (এবং বিজয়ী) বখতিয়ার খিলজী মগধ ও গৌড় জয় করেন। মুসলমান কর্তৃক মগধ বিজয়কালে বিশ্বম্ভরশূর নামক জকৈ রাজকুমার দু’শত জলযান, বহু পরিবার ও সৈন্যসামন্তসহ পূর্বাভিমুখে পলায়ন করে চন্দ্রনাথ পর্বতে শিবদর্শনে উপস্থিত হন (বর্তমান চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে)। চন্দ্রনাথ তীর্থ দর্শন শেষে প্রত্যাগমন কালে তাঁর সঙ্গীগণসহ ভুলুয়ার নিকটবর্তী মেঘনার বুকে নৌকায় রাত্রিযাপন করেন। রাত্রিকালে তিনি স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত হলেন, ‘বৎস, তোমার অর্ণবপোতে, দক্ষিণ পার্শ্বে নদীগর্ভে জলমগ্ন বারাহীমূর্তি উদ্ধার কর এবং যথারীতি অর্চ্চনা কর, অচিরেই তুমি এ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অধিশ্বর হবে।’ স্বপ্নে ইহাও প্রত্যাদেশ হলো বিশ্বম্ভর শূর যেন একটি পশু বলিদ্বারা ত্যাগ স্বীকার করেন। অনন্তর একটি ছাগ বলি দেয়া হল। কিন্তু ঐ দিবসটি নিবিড় কুজ্ঝটিকাকালে আকাশমন্ডল সমাচ্ছন্ন থাকায় মূর্তিটিকে সঠিকভাবে স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। দক্ষিণমুখী করে সংস্থাপনের স্থলে পূর্বমুখী করে সংস্থাপন করা হয়েছিল। সূয উদিত হলে সে ভ্রম সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিস্ময়ে হতবাক হযে সকলে ‘ভুল হুয়া’, ‘ভুল হুয়া’ বলে চিৎকার করে উঠল। সম্ভবত এ ভুলহুয়া কথাটি হতে কালক্রমে ‘ভুলুয়া’ নামের উৎপত্তি হয়েছে। উপরোক্ত ঘটনাটি কিংবদন্তি আকারে এত বেশি আলোচিত হয়েছে যে, এর ঐতিহাসিক সত্যতা অস্বীকার করা যায় না।

 

সোনাইমুড়ী শহীদ মিনার

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি।

 

মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বাঙ্গালি তাজা রক্তে যে দিন ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, বাঙ্গালির ঐ রক্তঝরা দিনটিকে বিশ্বে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ও ভাষা শহীদদের সম্মান জানানোর জন্যই এ শহীদ মিনার।

 

সোনাইমুড়ী উপজেলায় সোনাইমুড়ীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ডাকবাংলো প্রাঙ্গনে মনোরম পরিবেশে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুউচ্চ এ শহীদ মিনারটি। মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ইউনূছ ও আবুল কাসেমসহ ১৯৭২ সালে কতিপয় উৎসাহী যুবকের উদ্যোগে ও তদানীন্তন এম.পি. জনাব অধ্যাপক মোঃ হানিফ সাহেবের প্রচেষ্টায় এ শহীদ মিনারটি স্থাপিত হয়্ পরে ২০০১ সালে নোয়াখালী জেলা পরিষদের আর্থিক সহযোগিতায়, জনাব গোলাম মোস্তফা ভূঞা ও বাবু লীলাময় মজুদারের তত্ত্বাবধানে এ শহীদ মিনারটি পুনঃনির্মাণ করা হয়।

 

বিভিন্ন জাতীয দিবসে প্রতি বছর স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সর্বস্তরের জনগণ শহীদের রক্তদান ও আত্মাহুতির স্মরণে শহীদ মিনারে এসে শ্রদ্ধাঞ্জুলি প্রদান করে।